জীবনে বাবার প্রভাব কলমে- শেখ জুনায়েদ জারিফ, সিরাজগঞ্জ।
পিতা-পুত্র
জীবনে বাবার প্রভাব
কলমে- শেখ জুনায়েদ জারিফ,
শ্রেণি: ৩য়, রোল: ০২, উল্লাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
“বাবা মানে হাজারো কষ্টের মাঝে এক টুকরো সুখের হাসি, বাবা মানে এক আকাশসমান ভালোবাসা,
যাকে আমি বড্ড ভালোবাসি।”
পৃথিবীতে ‘বাবা’ শব্দটি কেবল দুটি অক্ষরের একটি শব্দ নয়; এটি একটি বিশ্বাস, একটি নিরাপদ আশ্রয় এবং একজন সন্তানের পুরো পৃথিবী। একটি শিশুর জন্মের পর থেকে তার বড় হয়ে ওঠার প্রতিটি পদক্ষেপে বাবার অবদান জড়িয়ে থাকে। মা যেমন সর্বদা আমাদের কোলে আগলে রাখেন, বাবা তেমনি বাইরের সমস্ত ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে আমাদের রক্ষা করেন।
জীবনে বাবার প্রভাব কতটা গভীর, তা কোনো পরিমাপ দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির আমাদের মতো ছোট শিক্ষার্থীদের জীবনে বাবার ভূমিকা একটি মজবুত ভিত্তির মতো, যার ওপর দাঁড়িয়ে আমরা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি।
বাবা আমাদের অর্থ জোগান। বাবা আমাদের কোনো বিকল্প নয়। বিভিন্ন ভাষায় বাবাকে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকা হয়—যেমন ফাদার, আব্বু, পাপা বা ড্যাডি। কিন্তু সবার নামের পেছনে লুকিয়ে থাকে একই অনুভূতি। বাবা হলেন সেই মানুষটি, যিনি নিজের সব ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দিয়ে আমাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য দিনরাত পরিশ্রম করেন। আমাদের একটু ভালো রাখার জন্য তিনি নিজে রোদে পোড়েন, বৃষ্টিতে ভেজেন কিংবা ক্লান্তিতে অবসন্ন হন।
আমাদের প্রথম নায়ক ও আদর্শ হচ্ছেন বাবা। ছোটবেলা থেকেই প্রতিটি সন্তানের কাছে তার বাবা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সাহসী মানুষ। আমাদের কাছে বাবা মানেই একজন সুপারহিরো।
অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব
আমরা যখন ছোট থাকি, তখন বাবার হাঁটা, কথা বলা, মানুষের সঙ্গে ব্যবহার করা—সবকিছুই খুব মনোযোগ দিয়ে দেখি এবং তা নকল করার চেষ্টা করি।
সততার শিক্ষা
বাবা কীভাবে সততার সঙ্গে তাঁর কাজ করেন, তা দেখে আমরাও সৎ হতে শিখি।
শৃঙ্খলা
প্রতিদিন সকালে নিয়ম মেনে বাবার কর্মস্থলে যাওয়া এবং পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া আমাদের নিয়মানুবর্তিতা শেখায়।
শিক্ষাজীবনে বাবার অবদান
আমাদের পড়াশোনা ও জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে বাবার ভূমিকা অতুলনীয়। প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে আমরা যখন বাবাকে নতুন বই বা খাতা দেখাই, তখন তাঁর আনন্দের সীমা থাকে না।
পড়াশোনায় উৎসাহ দেওয়া
সারাদিন কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত থাকার পরও রাতে বাড়ি ফিরে বাবা যখন জিজ্ঞেস করেন, “আজ স্কুলে কী কী পড়ালে?” বা “হোমওয়ার্ক শেষ হয়েছে?”—তখন পড়াশোনার প্রতি আমাদের আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।
ভয় দূর করা
কঠিন কোনো অঙ্ক বা বিজ্ঞানের কোনো বিষয় বুঝতে না পারলে বাবা যখন সহজ করে বুঝিয়ে দেন, তখন আর ভয় থাকে না; বরং আনন্দ হয়।
অনুপ্রেরণা দেওয়া
পরীক্ষায় ভালো করলে বাবার মুখের সেই চওড়া হাসি দেখে নিজেকে আরও ভালো করার শক্তি পাই।
নৈতিকতা ও মূল্যবোধ গঠনে বাবার ভূমিকা
একটি সুন্দর চরিত্র গঠনে বাবার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। বাবা আমাদের শুধু প্রতিযোগিতায় জিততেই শেখান না, বরং একজন ভালো মানুষ হওয়ার দীক্ষা দেন।
অন্যকে সাহায্য করা
বাবা যখন কোনো গরিব মানুষকে সাহায্য করেন বা কারও বিপদে পাশে দাঁড়ান, তা দেখে আমরাও দয়ালু হতে শিখি।
বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহ
পরিবারে সবার সঙ্গে বাবার মার্জিত ব্যবহার আমাদের শেখায় কীভাবে সমাজে সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে হয়।
ধৈর্য ও সহনশীলতা
জীবনের যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতেও বাবা যেভাবে শান্ত থেকে সমাধান খোঁজেন, তা আমাদের ধৈর্যশীল হতে অনুপ্রাণিত করে।
আবদার ও আনন্দের সঙ্গী
যা-ই আমরা শখের জিনিস চাই, বাবা অনেক সময় কষ্ট করে হলেও আমাদের সেই আবদার পূরণের চেষ্টা করেন। ছুটির দিনে বাবার সঙ্গে ক্রিকেট বা ফুটবল খেলা, ঘুরতে যাওয়া কিংবা বিকেলে একসঙ্গে সময় কাটানো আমাদের শৈশবকে রঙিন করে তোলে।
ইচ্ছা পূরণ: মেলা থেকে পছন্দের খেলনা কেনা, নতুন জামা বা গল্পের বই—সব আবদার যেন বাবার কাছেই জমা থাকে। বাবা নিজের জন্য কিছু না কিনেও সন্তানের ছোট ছোট ইচ্ছাগুলো হাসিমুখে পূরণ করেন।
বাবার ত্যাগের প্রতিচ্ছবি: আমরা যখন শান্তিতে ঘুমাই, বাবা তখন আমাদের ভবিষ্যতের কথা ভাবেন। নিজের পুরনো জুতো বা জামাটি বছরের পর বছর ব্যবহার করেও সন্তানের জন্য সেরা জিনিসটি এনে দেন। নিজের কষ্টের কথা বাবা কখনো মুখে বলেন না। তাঁর পকেটে টাকা না থাকলেও সন্তানের মুখে কখনো ‘না’ শব্দটি উচ্চারণ করতে তিনি দ্বিধা করেন। এই নিঃস্বার্থ একজন বাবাকে পৃথিবীর সবচেয়ে মহান মানুষে পরিণত করে।
বাবা দিবস ও আমাদের দায়িত্ব: প্রতিবছর জুন মাসের ৩য় রবিবার বিশ্বজুড়ে ‘বাবা দিবস’ পালন করা হয়। যদিও বাবার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের জন্য কোনো বিশেষ দিনের প্রয়োজন হয় না, তবুও এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বাবার অবদানকে শ্রদ্ধা জানানোর গুরুত্ব কতটা।
আমাদের মতো ছেলেমেয়েদের করা উচিত:
বাবার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং মেনে চলা। পড়াশোনায় ভালো মন দিয়ে বাবাকে আনন্দ দেওয়া।
বাবা যখন ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরবেন তখন তাঁকে এক গ্লাস পানি দেওয়া বা মিষ্টি করে কথা বলে তাঁর ক্লান্তি দূর করা।
একটি সুন্দর ও সফল জীবনের পেছনে বাবার অবদান একটি অদৃশ্য শক্তির মতন। রোদ-বৃষ্টিতে বাবা যেমন ছাতার মতো আমাদের মাথার উপর থাকেন, তেমনি জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে তিনি আমাদের পথ দেখান। মুক্ত পঠন আয়োজিত এই সুন্দর প্রতিযোগিতায় দাঁড়িয়ে আমি গর্বের সাথে বলতে চাই—আমার বাবাই আমার জীবনের অনুপ্রেরণা। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, পৃথিবীর সব বাবা যেন সুস্থ এবং দীর্ঘজীবী হন।
সবশেষে কবি কামিনী রায়ের কবিতার মতো করেই বলা যায়—
“পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি, এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মতো সুখ কোথাও কি আছে?
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।”
নিজের সুখ ভুলে আমাদের সুখে রাখা সেই মহান বাবাকে জানাই—শুভ বাবা দিবস!