ইদের চাঁদ- কলমে সৈকত ইসলাম (রংপুর)
ঔপন্যাসিক-সৈকত ইসলাম
ইদের চাঁদ
কলমে সৈকত ইসলাম (রংপুর)
আমার বয়স তখন ৮/১০ বছর। রাতে প্রায়ই ভয়াবহ স্বপ্ন দেখতাম। ভুত, প্রেত, ডাইনি, ছেলেধরা আরও কত কিছু এসে আমাকে আক্রমণ করতে চাইতো। আমি ভয় পেতাম, রাতে ঘুম হতো না। সকালবেলা এবং রাতে শোবার সময় ঘটনাগুলো আব্বাকে বলতাম। আব্বা আমাকে নিজের খাটে ডেকে নিতেন। নিজের বাম হাতটা প্রসারিত করে দিয়ে বলতেন, এটার ওপর মাথা রেখে ঘুমা। আমি আব্বার হাতকে বালিশ বানিয়ে আব্বার বলা কিসসা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম। সে রাতে ভুত, প্রেতের স্বপ্ন তো দূরে থাক, কোনো স্বপ্নই দেখতাম না। একটানা ঘুম। সেই যে ঘুমাতাম, সকালে না ডাকা পর্যন্ত উঠতাম না। এতো শান্তির ঘুম আমি আমার জীবনে কম ঘুমিয়েছি। আমি ভাবতাম, আব্বার হাতে মনে হয় জাদু আছে।
সেই সময়টায় আব্বা প্রতিদিন ৪/৫ কিলোমিটার রাস্তা সাইকেল চালিয়ে আমাকে নিয়ে যেতেন মাদ্রাসায়। আমি ভাবতাম, আব্বা কত শক্তিশালী।
আব্বার সেই শক্তিশালী হাত-পা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে এলো। প্রকৃতির নিয়মে আব্বার গায়ের টাইট চামড়া কুঁচকে ঢিলেঢালা হয়ে গেল। একদিন হঠাৎ বড়ভাই ফোন করে বললো, “ভাই, আব্বা কেমন করছে তাড়াতাড়ি বাড়ি আয়।” শুধু এটুকুই। আমি বুঝেছিলাম, আমার আব্বা দুনিয়াতে নেই। আব্বা তখন আসরের নামাজের আজান দিতে যাচ্ছিলেন। আজানটা সেদিন আর দেওয়া হয়নি। সেদিন থেকেই এলোমেলো হয়ে গেছে আমার পুরো পৃথিবী। একটা সুস্থ মানুষ, এভাবে কীভাবে নাই হয়ে যায়?
গতবছর কুরবানির ইদের চাঁদ যেদিন ওঠে, সেদিন আমার আব্বা মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যান। একটা বছর কীভাবে যেন কেটে গেল।
ছোটবেলায় আব্বা হাত ধরে ইদের চাঁদ দেখাতে নিয়ে যেতেন। সেদিন আর আকাশের চাঁদ দেখতে যাওয়া হয়নি, বুকের চাঁদকে সেদিন নিজের দু’হাতে শুইয়ে রেখে এসেছি শেষ ঘরে।
মাগরিবের নামাজ পড়ে চাঁদ দেখতে গিয়েছিলাম আজ। আকাশে ইদের নতুন চাঁদ দেখে জানতে ইচ্ছে করে আল্লাহ, আমার বুকের চাঁদ, আমার আব্বা তোমার কাছে কেমন আছে মা’বুদ?
আমার আব্বা বই পড়তে পছন্দ করতেন খুব। কুরআন হাদিসের বই ই বেশি পড়তেন। বাড়িতে যাবার সময় প্রায়ই আমি বই নিয়ে যেতাম, মানুষকে দিয়ে পাঠাতাম। সেই বইগুলো আব্বা তার কমজোর হাতে ধীরে ধীরে যত্ন করে সেলাই করতেন যেন পাতা খুলে পড়ে না যায়।
আমার আব্বা মসজিদে আজান দিতেন, মানুষকে নামাজ পড়াতেন। গলায় বিশেষ কোনো সুর ছিল না কিন্তু তারপরও আব্বার আজান আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। আমাদের বুক ভরে উঠতো। যেই হাত, গলার যেই স্বর আমাকে সকল বিপদে সাহস যুগিয়েছে, রক্ষা করেছে, আব্বার সেই হাতটা নিজের হাতে নেওয়ার আগেই তুমি আমার আব্বাকে নিয়ে নিলে আল্লাহ।
তুমি আমার কলিজার টুকরা, আমার বুকের চাঁদকে ভালো রেখো মা’বুদ। আব্বার গলার সেই বুলন্দ আওয়াজ তুমি আমার গলায় দাও আল্লাহ। আমিও চিৎকার করে বলতে চাই, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার।
আমার আব্বার জন্য দোয়া করবেন…