বিশ্ব সাক্ষরতা দিবস-(International Literacy Day)

0
WhatsApp Image 2026-09-09 at 00.31.25

৮ই সেপ্টেম্বর, বিশ্ব সাক্ষরতা দিবস (International Literacy Day) নিরক্ষরতার অন্ধকার দূর করে শিক্ষা ও সচেতনতার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে দিনটি প্রতি বছর আমাদের মাঝে আসে। ইউনেস্কোর উদ্যোগে এ দিবস ১৯৬৬ সালে সূচনা এবং ১৯৬৭ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। প্রতি বছর আমরা নানা কর্মসূচি পালন করি এবং সভা-সেমিনারে স্বাক্ষরতার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পেরেছি?

 

সময়ের সাথে সাথে স্বাক্ষরতার সংজ্ঞা দিন দিন পরিবর্তন হচ্ছে। একসময় সাক্ষরতার অর্থ ছিল বর্ণ চেনা, নিজের নাম লেখা কিংবা সহজ কোনো লেখা পড়তে পারা। আজকের পৃথিবীতে সেই সংজ্ঞা আর যথেষ্ট নয়। বর্তমান বাস্তবতায় একজন স্বাক্ষর মানুষকে শুধু পড়তে ও লিখতে জানলেই হবে না; তাকে তথ্য বুঝতে হবে, সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে, নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে হবে। বিশেষ করে ডিজিটাল যুগে অনলাইনের তথ্য যাচাই, নিরাপদে প্রযুক্তি ব্যবহার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল প্রয়োগ এবং ভুয়া খবর ও গুজব শনাক্ত করার সক্ষমতাও আধুনিক স্বাক্ষরতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সাক্ষরতা ও শিক্ষার বিস্তারে কম সাফল্য অর্জন করেনি। প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় সর্বজনীন ভর্তি, ছেলে-মেয়ের অংশগ্রহণে সমতা, বিনামূল্যে পাঠ্যবই, উপবৃত্তি এবং বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি শিক্ষার সুযোগকে আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত করেছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রমও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একসময় বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা বহু শিশু আজ শিক্ষার আওতায় এসেছে-এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের বড় অর্জন।

তবে অর্জনের পাশাপাশি বাস্তবতার কিছু কঠিন প্রশ্নও রয়েছে। বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া আর সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত হয়ে ওঠা এক বিষয় নয়। একজন শিশু নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, পরীক্ষায় পাস করছে; কিন্তু সে যদি একটি সহজ গল্প পড়ে তার অর্থ বুঝতে না পারে, নিজের ভাষায় বিষয়টি প্রকাশ করতে না পারে কিংবা মৌলিক একটি গাণিতিক সমস্যা সমাধান করতে না পারে, তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

আমাদের মনোযোগ শুধু ‘কতজন স্কুলে গেল’-এই হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। দেখতে হবে ‘কতজন সত্যিকার অর্থে শিখল’। প্রাথমিক শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত মৌলিক পড়া, লেখা ও গণিতের দক্ষতা নিশ্চিত করা। শিশুকে মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার্থী নয়, চিন্তাশীল ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ঝরে পড়ার সমস্যা। দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, পারিবারিক সংকট, বাল্যবিবাহ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষার মানের বৈষম্য বিভিন্ন কারণে অনেক শিশু শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়ে। চর, হাওর, দুর্গম গ্রাম, পাহাড়ি এলাকা কিংবা শহরের বস্তিতে বেড়ে ওঠা শিশুদের জন্য শিক্ষার সুযোগ অনেক সময় সমান থাকে না। তাই ‘সবার জন্য শিক্ষা’ কথাটি শুধু স্লোগানে নয়, বাস্তব জীবনেও প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব রাষ্ট্রের হলেও এককভাবে সরকারের পক্ষে এ কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। পরিবারকে ঘরে পড়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিদ্যালয়কে হতে হবে শিশুবান্ধব ও নিরাপদ। শিক্ষককে শুধু পাঠ্যবই শেষ করার দায়িত্বে সীমাবদ্ধ না রেখে শিশুর শেখার সহযাত্রী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় পাঠাগার ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সক্রিয় করতে হবে। যারা কোনো কারণে শৈশবে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের জন্যও আজীবন শেখার সুযোগ তৈরি করা জরুরি।

বিশ্ব স্বাক্ষরতা দিবস অর্জনের উৎসব নয়; এটি আত্মসমালোচনারও দিন। আমাদের স্বাক্ষরতার হার বাড়ার সঙ্গে মানুষের জ্ঞান, সচেতনতা ও জীবনমান কতটা বেড়েছে? কতজন শিশু বিদ্যালয়ে গিয়ে নিজের সম্ভাবনা বিকশিত করার সুযোগ পাচ্ছে? কতজন তরুণ প্রযুক্তিকে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের কাজে ব্যবহার করছে? আর কতজন মানুষ এখনো গুজব, অপতথ্য ও অজ্ঞতার শিকার হচ্ছে?

আমাদের প্রত্যাশা কোনো শিশু দারিদ্র্য বা বৈষম্যের কারণে বই থেকে দূরে থাকবে না; কোনো তরুণ শিক্ষার সুযোগ হারাবে না; কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নতুন করে শেখার ইচ্ছা পোষণ করলে তার সামনে দরজা বন্ধ থাকবে না। শিক্ষা হবে শুধু পরীক্ষায় পাসের উপায় নয়, বরং জীবনকে বুঝে নেওয়ার শক্তি।

সাক্ষরতার প্রকৃত প্রাপ্তি কোনো সনদ, পরিসংখ্যান কিংবা আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ নয়। একজন শিশুর চোখে জ্ঞানের আলো, একজন তরুণের আত্মবিশ্বাস, একজন মায়ের সচেতনতা এবং একজন নাগরিকের দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তের মধ্যেই এর প্রকৃত সাফল্য নিহিত।

বিশ্ব সাক্ষরতার দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক-শিক্ষার আলো শুধু বিদ্যালয়ের চার দেয়ালে আটকে থাকবে না; তা পৌঁছে যাবে প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি জনপদে, প্রতিটি মানুষের জীবনে। কারণ স্বাক্ষরতার আলো যত বিস্তৃত হবে, তত শক্তিশালী হবে আমাদের মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্র। আর সেই আলোকিত মানুষদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে একটি জ্ঞানভিত্তিক, মানবিক, সচেতন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

 

Share this news as a Photo Card

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
08 September 2026

বিশ্ব সাক্ষরতা দিবস-(International Literacy Day)

www.muktopathon.com |
muktopathon
muktopathon