আষাঢ় মাস, তোষা পাট ও মোকসেদ দাদা
আষাঢ় মাস, তোষা পাট ও মোকসেদ দাদা
কলমে- কবি ও কথা সাহিত্যিক সুকুমার সুর রায়
ভ্যাপসা গরম। রোদ আছে। দক্ষিনা বাতাস আছে। মেঘও আছে। কিন্তু বৃষ্টি নাই। বাড়ির পালানে তোষা পাটের চারা লক লকিয়ে বড় হচ্ছে। কয়েকদিন আগের বৃষ্টিতে ঘাসের ডগা পাটের চারা ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টায় আছে। এরই মধ্যেই নতুন করে বৃষ্টি হলে পাটক্ষেত আগাছায় ছেয়ে যাবে।
মোকছেদ দাদার বয়স হয়েছে সত্তুর বছর। পাচন হাতে নিয়ে পাটের ক্ষেত নিড়ানী দিতে শুরু করেছেন তিনি। দুপুর গড়িয়ে জোহরের ওয়াক্ত হয়ে গেছে। পুকুরপাড়ের মসজিদ থেকে আজানের শব্দ ভেসে আসছে। আল লা .. হু আকবর, আল লা .. হু আকবর।
তারপর শুনশান নীরবতা। নামাজ শেষে ক্ষেতের আইলা রাস্তা ধরে ফিরছিল দক্ষিন পাড়ার আইজ্জ্বল শেখ। সেই চিৎকার করে ডাকতে লাগলো – আবু হাসান, আবু হাসান!
তোমার আব্বাজান পাট ক্ষেতের মধ্যে পইড়া রইছে !
কিছু শোরগোল শোনা গেল। কান্নার আওয়াজও ভেসে এলো। লোকজন এগিয়ে এসে ভিড় করে দাঁড়ালো।
মোকছেদ দাদার পরনে একটি মাত্র নেংটি কাপড়। সেজদা দেওয়ার মত তিনি উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। পাটক্ষেতের নরম বৃষ্টি ভেজা মাটিতে তাঁর কপাল গেঁথে আছে। পুরো শরীর ঘামে ভিজে আছে। পাঁজরের হাড়গুলি একটা একটা করে গোনা যায়। পেটের চামড়া যেন পিঠের সাথে লেগে আছে!
কোথা থেকে যেন ভোজবাজির মত মাটির কলসি ভর্তি পানি নিয়ে দৌড়ে ছুটে এলো ফতে’বু। চিৎকার করে বলতে থাকে ভিড় কমাও, ভিড় কমাও। মোকছেদ দাদার মাথা কোলের উপর টেনে নিয়ে পানি ঢালতে লাগলো সে। বিড়বিড় করে বলতে লাগলো। ও দাদা! চোখ মেইল্যা চাও, কথা কও।
মোকছেদ দাদা আর কিছুতেই চোখ মেলে তাকালেন না।
আবু হাসান চাচা ডুকরে কেঁদে উঠলেন।
দুই দিন পার হয়া গ্যাছে, আব্বাজানের প্যাটে এক মুঠ ভাতের দানা পড়ে নাই। দুইদিন বাদে আইজ বিয়ানব্যালা কাঁটোলের রোয়া দিয়া কাউনের জাউ খাইছিল । তারপরেই এই পাটের ক্ষ্যাত নিড়ান দিতি হাতে পাঁচন নিয়্যা বাইর হয়্যা আইছে.এ.এ. ।
মোকছেদ দাদাকে ধরাধরি করে বাড়ির উঠানে নেওয়া হল।
আকন্দ বাড়ির হায়াত চাচী ফিস ফিস করে বলতে লাগলো। পাট ক্ষ্যাত লাগোয়া গোরস্তান! আষাঢ় মাসের ভর দুপুর ব্যালা! কীসের ত্থনে কী হইছে তা কি কওয়া যায়!
হায়াত চাচীর দুই ছোট জা’ও লম্বা ঘোমটার ভিতর থেকে বিজ্ঞের মতো মাথা ঝুঁকিয়ে বড় জা’র কথার সাথে ভয়সূচক সম্মতি জ্ঞাপন করলেন!