বাবার সাথে বৃষ্টিমুখর একদিন ও কৃষ্ণচূড়ার কথা
বাবার সাথে বৃষ্টিমুখর একদিন ও কৃষ্ণচূড়ার কথা
কলমে-সাবরিনা তাহ্সিন, ময়মনসিংহ
ছোটবেলা থেকে দাদুকে দেখতাম গাছের প্রতি তাঁর মধুর ভালোবাসা ও মমত্ববোধ।দাদাবাড়ীর চারপাশ জুড়ে দাদু শখ করেই নানা প্রজাতির গাছ লাগিয়েছিলেন।নানা রকমের গাছের শোভা-সৌন্দর্যের কারণেই আমাদের দাদাবাড়ীটা হয়ে উঠতো শহরের বুকে এক টুকরো সবুজে ঘেরা এক স্বর্গ।এরপর সেই সবুজ স্বর্গ ভেঙ্গে বিল্ডিং নির্মাণ করা হয়।তবে গাছের প্রতি দাদুর ভালোবাসা আমি তখন থেকেই নিজের মধ্যে ধারণ করি।আমাদের নিজেদের বাসার ছাদে আর বারান্দায় বিভিন্ন ধরণের গাছ লাগাই।বাসায় গাছ থাকলে পরিবেশের ভারসাম্য যেমন রক্ষিত হয় ,তেমনি গাছের সবুজ, স্নিগ্ধরূপ মনকেও প্রশান্ত রাখে।
যাই হোক ,বৃক্ষ-প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা থেকেই আমি বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের সাথে যুক্ত হই। সেই সুবাদে একদিন ফেসবুকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের একটি উদ্যোগ চোখে পড়ে।প্লাস্টিকের বিনিময়ে বিনামূল্যে গাছ বিতরণ কর্মসূচী।আয়োজনটি সকলের জন্য উন্মুক্ত। আমার খুব ইচ্ছে করলো আয়োজনটিতে অংশগ্রহণ করতে।কিন্তু এতো দূরের পথ।একা তো যেতে দিবে না।তাই আব্বুকে বলি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্লাস্টিকের বিনিময়ে এই ব্যাতিক্রমী আয়োজন অংশগ্রহণ করবো।আকাশে তখন কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে।আর ঘড়িতে তখন সকাল ১১:০০ টা।আব্বু আবহাওয়ার অবস্থা দেখে বললেন, ” আকাশের যে অবস্থা, মনে হয় বৃষ্টি হবে।
বৃষ্টিতে অনুষ্ঠান যদি না হয়।আরও ভালোভাবে নিশ্চিত হয়ে নেও।”
আব্বুর কথায় আমিও বিষয়টা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ি এবং বিজ্ঞপ্তিটা আবার দেখি। দেখা গেলো ,সেদিনই অনুষ্ঠান হবে।আব্বুকে তা জানাই। আব্বুর সহজ জবাব, ” আচ্ছা ,দেখা যাক। যাওয়া যায় কী না।”
আব্বুর জবাব শুনে আশাহত মন নিয়ে গোসল করি ,মধ্যাহ্নভোজ সম্পন্ন করি।
আব্বু হঠ্যাৎ বলে বসলেন ,” আচ্ছা, কতোগুলো প্লাস্টিক নিতে হবে ?একটা ব্যাগে করে নেও।”
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি ,” প্লাস্টিক ব্যাগে নিতে বলছো মানে আমরা কী তাহলে যাচ্ছি? “
আব্বু বললেন, ” হুম, চলো যাই। ব্যাতিক্রমী আয়োজনে একটু শরিক হলে ক্ষতি কী।আর আমাদের বাসায় তো এমনিতেই প্লাস্টিক জমে যাচ্ছে।”
আমি চটজলদি প্রস্তুত হয়ে নিলাম। আম্মু শরীর অসুস্থ নিয়ে আর গেলেন না। ছোট বোনটার ঢাকার ভার্সিটিতে ক্লাস চলছিলো।যাই হোক, প্রকৃতি তখন মেঘলা।হালকা স্নিগ্ধ মৃদুমন্দ বাতাস বইছিলো।তাই ছাতাটাও সাথে নিলাম।
আমি আর আব্বু রিকশায় কিছুদূর যেতে না যেতেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো।আমাদের তাই রিকশা থেকে শেডের নীচে দাঁড়াতে হলো।আর ১৫ মিনিটের মধ্যেই অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা ।এখন ধুম বৃষ্টিতে কী অনুষ্ঠান স্থগিত করে দিতে পারে কী না জানার জন্য আয়োজক কমিটির নাম্বারে যোগাযোগ করি।তারা জানায় যে ,অনুষ্ঠান হবে।বৃষ্টি আরেকটু কমলে আমরা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। আর ২০ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম। পৌঁছাতেই তো চক্ষু চড়কগাছ।শত শত গাছের চারা আর শতশত প্লাস্টিকের বোতল ব্যাগে ভরে লাইন ধরে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে বৃক্ষপ্রেমী মানুষের ভিড়।আমিও প্লাস্টিকের বোতল ব্যাগে নিয়ে লাইনে যুক্ত হলাম। ৫:৩০ মিনিটে অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা থাকলেও প্রধান অতিথি আসতে দেরী হওয়াতে অনুষ্ঠান অব্যহতি কাল পরে ৫:৫০ মিনিটে শুরু হয়। তারপর প্লাস্টিকের বিনিময়ে সবার হাতে বৃক্ষের চারা তুলে দেওয়া হয়।অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।শেষের দিকে আমলকি ,নিম ,কৃষ্ণচূড়া ,লেবু, পেয়ারা গাছ আমাদের বাগানে ইতিমধ্যে আছে।তাই আমলকি গাছের চারা নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ততোক্ষণে আমলকী গাছের চারা একজনের কাছে হাতবদল হয়ে গেলো।আমার ভাগ্যে কৃষ্ণচূড়া গাছের চারা রইলো।প্লাস্টিকের বিনিময়ে আমি অনিন্দ্য সুন্দর কৃষ্ণচূড়া গাছের চারা পেলাম। ততক্ষণে সন্ধ্যা প্রায় আসন্ন। আবার গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হলো।আব্বু আর আমি কৃষ্ণচূড়া গাছের চারা পলিব্যাগে ভরে ছাতা মাথায় রিকশায় উঠলাম। বৃষ্টির মাথায় করে বাড়ি পৌঁছালাম। আব্বুর সাথে কাটানো সেই বৃষ্টিমুখর দিন আর কৃষ্ণচূড়ার গল্পটি স্মৃতিমধুর হয়ে থাকবে।
আকুয়া জুবিলী কোয়ার্টার, ময়মনসিংহ